কাপুরুষ ভালোবাসা!
ফোনের অপর প্রান্তে রিং হচ্ছে। কেউ রিসিভ না করায় লাইনটি কেটে গেল। এখনই আরেকবার কল করব কিনা ভাবছি। এতো ভাবার কী আছে? আবার চেষ্টা করলাম।
– হ্যালো (আমি ঠিকভাবে কণ্ঠ বুঝতে পারিনি)
– আসসালামু আলাইকুম ফুপু। কেমন আছেন? আমি সজীব।
– ও সজীব ভাইয়া। আমি মিলি। কেমন আছেন?
মিলি। আমার ফুপাতো বোন। বয়সে আমার চেয়ে ৩-৪ বছরের ছোট। বেশ কয়েক বছর আগে দেখেছি। মুখটা এখন অস্পষ্ট হলেও একদম ভুলে যাইনি। যখন শেষবার দেখেছিলাম তখন ওর বয়স ৭ কি ৮ হবে। একটু রাগচটা আর মেজাজি। একারণে ক্ষেপিয়ে বেশ মজা পেতাম। ইন্টার শেষ করে ঢাকা এসে নতুন মোবাইল নিয়েছি। তাই ফুপুর সাথে কথা বলার জন্য কল করা।
– ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
– ভালো। এটা কি আপনার নাম্বার?
– হুম। ফুপু কই?
– পিছনে। কাজ করে।
– ও, আচ্ছা। তোর কী খবর? কেমন আছিস? এবার কোন ক্লাসে পড়িস?
– ভালো আছি। নাইনে পড়ি।
– ওমা! তুই তো তাহলে বড় হইয়া গেছিস। সামনে বিয়া-শাদি দেওয়া লাগবে।
– (মিলির হাসি) মামা-মামী কেমন আছে?
– ভালো আছে। আমি ঢাকা। নতুন ফোন নিয়েছি তো, তাই কল করেছি।
– আগে তো কোনদিন কল করেন নাই। আর আমাদের বাড়িও আসেন না। আপনাকে সেই কবে দেখেছি মনে নাই।
– ফোন তো সবে কিছুদিন হয় নিলাম। আর বাসার ফোন থেকে আব্বুই তো কথা বলতো। তাই আমি কল করতাম না। আর আমি যখনই তোদের বাড়ি যেতাম তখনই শুনতাম তুই তোর বোন-দুলাভাইর বাড়ি। দেখবি কীভাবে?
– ভালো হইছে। তাই বলে কি আমি বেড়াবো না?
– হুম, বেড়াবি না কেন? বোন-দুলাভাইর বাড়ি বেড়াবি। আমাদের বাড়িও আসবি না। আবার না দেখার জন্য অনুযোগও করবি।
– আপনি বেড়াইতে আইসেন।
– ঢাকা থেকে বাড়ি গেলে তোদের বাড়ি আসবো। ঠিক আছে, ফুপু এলে বলিস আমি কল করেছিলাম।
– আচ্ছা ঠিক আছে।
শুরুটা ঠিক এখান থেকে কিনা জানি না। যেহেতু এখন বাসা থেকে দূরে থাকি আর নতুন মোবাইল হাতে তাই প্রায়ই বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলতাম। আর ফুপুর ফোনটা মিলির কাছে থাকায় ওর সাথে প্রায়ই কথা হতো।
আমি বরাবরই একটু ফাজিল টাইপের। আর ভাব নিয়ে মিশতে পারি না। কথায়-বার্তায় হিসেব কষতে পারি না। ফালিজ তো – তাই কথায় দুষ্টামির মাত্রা বেশি। মিলির সাথে কথা হতো। প্রায়ই কথা হতো। নানান বিষয় নিয়ে কথা হতো।
অনেক দিন ফুপুবাড়ি যাই না। মিলিকে কথা দিয়েছিলাম শীত শেষে ওদের বাড়ি বেড়াতে যাব। আমি সব সময় চেষ্টা করি কথা রাখার। একান্তই অপারগ না হলে ওয়াদা ভাঙ্গি না। তাই গরমের শুরুতে ওদের বাড়ি গেলাম। একা গেলাম।
আমার ফুপুবাড়ি গ্রামে। যখন পৌঁছলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। উঠোনে দাঁড়িয়েই ফুপুকে পেলাম। সালাম বিনিময় করে কুশলাধি জানতে চাইলাম। ফুপুর পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা যে মিলি তা বুঝতে কষ্ট হলো না। ওর এখন অনেক পরিবর্তন। ফুপু না থাকলে হয়তো ওকে আমি চিনতে পারতাম না। নতুবা চিনতে কষ্ট হতো।
মিলি যে এসময়ে কোথাও বেড়াতে যাবে না তা পূর্বানুমেয়ই ছিল। যদিও আমি আগাম বার্তা ছাড়াই এসেছি। ঘরে গিয়ে খাটে বসে ফুপুর সাথে কথা বলছি। ফুপুর একপাশে আমি আরেকপাশে মিলি। মিলি নিশ্চুপ আর আমি বক্তা। ওর মুগ্ধ দৃষ্টি আর আমার শিহরণ।
এবার আমার ফুপুবাড়ি সম্পর্কে ছোট্ট একটা পরিচিতি দেওয়া দরকার। আমার ৩ জন ফুপাতো বোন আর ২ জন ফুপাতো ভাই। মিলির পরে আরেকটা ভাই। মিলির আগেরজনও ভাই। সে আমার বড়। তার ছোট্ট একটা মেয়ে। বয়স ৭-৮ মাস হবে। ভাই-ভাবী এ সংসারেই থাকে। বাকি দুইবোন সবার বড়। আলাদা সংসার।
আমার দেখভালের দায়িত্ব পড়ল মিলির ওপর। আমার খাওয়া-দাওয়া করানো, বিছানা করে দেওয়া—এইসব আরকি। আর এই সুযোগে আমি ব্রাশে পেস্ট লাগানো থেকে শুরু করে জুতো এগিয়ে দেওয়ার কাজও করিয়ে নিতাম। যে কয়দিন ফুপুবাড়ি ছিলাম মিলি ছিল আমার দায়িত্ববান অ্যাসিস্টেন্ট।
আমি যেদিন ফুপুবাড়ি পৌঁছলাম সেদিন ফুপা বাড়ি ছিলেন না। কাজ থাকায় অন্য কোথাও ছিলেন। আমার আসার খবর ফোনে জানলেন। সেদিন রাতে ফুপা এলেন না।
আমি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মিলির টেবিলের বইপত্র নাড়াচাড়া করার সময় একটা ডায়েরি আবিস্কার করলাম। প্রথমে মিলি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। ডায়েরি পরে বুঝলাম ও গান পছন্দ করে।
অবশ্য ডায়েরিতে ছোট্ট একটা ঘটনা লেখা ছিল যা মিলি চায় না আবার না চাওয়ারও উপায় নেই।
পরদিন ফুপাতো ভাই-বোনদের সাথে ভালোই কাটলো। রাতে ফুপা এলেন। আমরা একসাথে খেলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ফুপা আমার সাথে নানা বিষয় নিয়ে কথা বললেন। মিলির বিয়ে প্রসঙ্গও উঠলো।
তাদের সবার ইচ্ছা মিলির এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ হলেই ওর বিয়ে দিবে। হাতে ভালো ছেলে আছে। সরকারি চাকুরিজীবি। বিয়ের সম্বন্ধটা ছেলে বাড়ি থেকেই এসেছে। ছেলে মিলিকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করে। তখন মিলি ক্লাস সেভেনে পড়ে।
আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে সম্ভবত মিলিই সবথেকে সুন্দর। আর মিলি ওর ডায়েরিতে এ বিয়ে করতে চায় না আবার ওর পরিবারের খুশিও নষ্ট করতে চায় না তা লিখে রেখেছিলো।
ফুপার এই কথাটা শুনে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বুঝতে পারছিলাম না ফুপা এই কথাটা আমায় কেন বললো। যদিও এই বিষয়ে আমার সাথে আলোচনা করাটা একেবারেই স্বাভাবিক।
আমি অনেক কিছু ভাবতে লাগলাম। সবশেষে শুধু এইটুকু বললাম—আমি মিলির এই বয়সে বিয়ের পক্ষে না।
সেদিন রাতে আমার মাথায় হাজারো ভাবনা। ফুপার কথাটা কি স্বাভাবিক ছিল? নাকি এটা ছিল আমার জন্য সতর্কবার্তা?
আমি জানি মিলি আমায় পছন্দ করে। আমি পছন্দ করি কিনা এর উত্তরে হয়তো ‘না’ বলতে পারব না।
মিলি আমাকে চাইতেই পারে। ওর চাওয়াটা অন্যায় না। আবার আমার কারণে যদি কোন সমস্যার সৃষ্টি হয় তাহলে সবার কাছে আমি মীর জাফর হয়ে যাব। এতোদিন পর ফুপুবাড়ি গিয়ে তাদের আশা, তাদের খুশি নষ্ট করার অধিকারও আমার নেই। হাজারও ভাবনা; দুর্ভাবনা। কখন ঘুমিয়েছি মনে নেই।
সকালবেলা আমার হাতে ব্রাশ তুলে দিয়ে মিলি বলল—
– আমার এক বান্ধবী আপনাকে পছন্দ করেছে। আপনাকে ওর সাথে প্রেমের অভিনয় করতে হবে।
– তুই স্ক্রিপ্ট লিখে দিস। আমি মুখস্থ করে ওর সাথে বলব।
মিলি চলে গেল। মন ভালো নেই। তাই সকালের খাওয়া পর্ব সেরে গঞ্জে গেলাম। উদ্দেশ্য লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে নদী দেখা। আমার মন ভালো না থাকলে নদী দেখতে ভালো লাগে। যখন ফিরলাম তখন প্রায় ১২টা।
বাড়ির পথে ঢুকতেই মিলির সাথে দেখা। সাথে ওর এক বান্ধবী। গাছতলায় বসে রুমালে ফুল তুলছে। আমায় দাঁড়াতে বলল। কিছু কথা বলবে। আমি দাঁড়ালাম। কিছু বলছে না দেখে বললাম—আমি বাসায় যাচ্ছি। যখন ইচ্ছে হয় আমায় বলিস।
আমি বাসায় আসতে না আসতেই মিলিও এসে হাজির। মিলি এখন একা। আমিও একা। আমার চোখের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল- কেউ কিছু বললে তুই রাজি হবি না।
মিলি চলে গেল। আমি একটু হাসলাম। নিজের অপারগতার জন্য হাসলাম।
মন ভালো নেই। তাই ব্যাগ গুছিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। ফুপুর দিকে তাকিয়ে শুধু এইটুকু বললাম—আমি চললাম।
আর কারো কাছ থেকেই বিদায় নেওয়া হয়নি। যেভাবে আসা—সেভাবেই চলে যাওয়া। ঠিক চলে যাওয়া নয়; পালিয়ে যাওয়া। আমি এমনই।
মিলির সাথে আবারও কথা হলো। ফোনে। কথা দিলাম আবার ওদের বাড়ি যাব।
মিলির এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ। প্র্যাকটিক্যাল বাকি। সব ঠিক থাকলে সামনেই বিয়ে। ওদের বাড়িতে আমার আগমন। সবকিছু স্বাভাবিক। আমি স্বাভাবিক। মিলিও স্বাভাবিক।
বাড়ির পেছনে রান্না হচ্ছে। মিলি আর ভাবী আমার জন্য পিঠা বানানোয় ব্যস্ত। আমি বসে ভাবীর সাথে কথা বলছি। মিলি শ্রোতা।
– ভাইয়া আপনি মিলিকে নিয়ে যান (ভাবীর কথার অর্থ বুঝতে আমার কষ্ট হয়নি)
– যাবে। সমস্যা কী? আমি যেদিন যাব আমার সাথে যাবে। মামাবাড়ি বেড়িয়ে আসবে। আবার না হয় আমিই দিয়ে যাব।
– আমি এভাবে যাওয়ার কথা বলি নাই।
(আমি মিলির দিকে তাকিয়ে) তুই আমার সাথে পালাবি?
মিলি আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে। শ্রোতা মিলি। দর্শক মিলি। আর অপারগ আমি।
কয়েকদিন পরে আমি চলে এলাম। এবার আর পালিয়ে নয়। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে। মিলির চোখে চোখ রেখে। মীর জাফর নয়, কাপুরুষ হয়ে।
আমি এখন ঢাকা। ফোনে ফুপুর নাম্বারটা ভেসে উঠল। মিলিকে আশা করেছিলাম। ফুপুর কণ্ঠ। কয়েকদিন পরে মিলির বিয়ে। আমি যেন অবশ্যই বিয়েতে আসি। আসবো বলে ফোনটা রাখলাম।
আমি জানি আমি যাব না। নিজের চোখে মিলির বিয়ে দেখতে পারবে না। নিজ হাতে হলুদ মাখানোর শক্তি আমার নেই। কাপুরুষ আমি। ভীরু আমি।
মিলির বিয়ে হয়ে গেছে। শশুরবাড়ি এখন ওর নতুন ঠিকানা। আমি ঢাকা। মিলিকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কথা বলতে চাই একটু সময়ের জন্য।
অপেক্ষা শেষ হলো। মিলি বাপের বাড়ি এসেছে। কথা হলো ফোনে, রাতে। ওর খোঁজ-খবর নিলাম। শশুরবাড়ির কথা শুনলাম। মিলি আমার ওপর রাগ। ওর বিয়েতে যাইনি। রাগ করাটাই স্বাভাবিক।
– আমি জানি তুই আমাকে ভালোবাসতি। আমি যদি তোর বিয়েতে যেতাম তাহলে আমাকে দেখলে তোর আরও বেশি কষ্ট হতো। তুই-ই বল আমি গেলে তুই কী করতি?
– জানি না। হয়তো আপনার সাথে পালাইতাম।
– দেখ, তোর পরিবারের সবার খুব ইচ্ছা আর আশা ছিল তোকে ওইখানে বিয়ে দিবে। এতবছর পর আমি গিয়ে যদি কোন ঝামেলা করতাম তাহলে তোর বাড়ির সবাই আমায় বেঈমান বলতো। সময় আমাদের পক্ষে ছিল না। আমি জানি তুই যখন ফোনে আমার সাথে কথা বলতি তখন থেকেই আমায় পছন্দ করো। আমাকে কখনো বলো নাই কেন?
– আপনি জানেন না, মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না? আপনাকে একটা কথা বলি?
– বল
– আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে। আপনি আমাদের বাড়ি আসলে আমার সাথে দেখা করবেন?
– ঠিক আছে। দেখা করব।
– আমি আপনার সাথে ফোনে কথা বলতে পারব না। আমার খুব কষ্ট হয়।
– ঠিক আছে। আমি চাই না তুই কষ্টে থাক। জানি কষ্ট ভোলা সহজ না। তারপরও চেষ্টা করিস মনে না করার। ভালো থাকার। আর আমায় কল না করার।
মিলির সাথে এখন আর কথা হয় না। ওর বিয়ের পর এখনও বাড়ি যাইনি। জরুরি প্রয়োজনে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি যাচ্ছি। তাই ভাবলাম যাওয়ার পথে ফুপুবাড়ি হয়ে যাব। উদ্দেশ্য মিলিকে দেওয়া কথা রাখা।
মিলির স্বামী শহরে থাকে। গুছিয়ে উঠতে না পারায় এখনও ওকে নিয়ে আসেনি। আর মিলি শশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িই বেশি থাকে।
যখন ফুপুবাড়ি পৌঁছলাম তখন বিকেল চারটা। বাড়িতে শুধু ফুপু আর ছোট ফুপাতো ভাই ফয়সাল। মিলি নেই। আমি থাকব না। থাকার মতো সময়ও নেই। ফুপু ফয়সালকে সাথে নিয়ে মিলির শশুরবাড়ি দেখে আসতে বলল। আমি বললাম সময় হবে না। ফয়সাল যেয়ে মিলিকে নিয়ে আসতে চাইল। আমি না করলাম। ফুপুবাড়ি থেকে আমি রওয়ানা দিলাম তখন বিকেল পাঁচটা। বাড়ি চলে এলাম। কাজ সেরে আবার ঢাকা।
ঢাকা এসেছি সপ্তাহখানেক হবে। ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ফুপুর নাম্বার। রিসিভ করতেই অপরপ্রান্তে আবিষ্কার করলাম মিলিকে।
– আপনি নাকি আমাদের বাড়ি আসছিলেন?
– হুম
– আমার সাথে দেখা করেন নাই কেন?
– তুই তখন শশুরবাড়ি ছিলি।
– তো কী হইছে? আপনি খবর দিলে আমি চলে আসতাম।
– আমি বেশি সময় ছিলাম না। হাতে তেমন সময়ও ছিল না। তাই ভাবলাম…….
– আপনি কতক্ষণ ছিলেন?
– ১ ঘণ্টার মতো।
– আমার শশুরবাড়ি থেকে আসতে ১৫ মিনিট সময় লাগে।
– তুই একা আসবি সেটা কি ঠিক হতো?
– তাহলে ফয়সালকে পাঠাইতেন। ও এসে নিয়ে গেলেও ৩০-৪০ মিনিটের বেশি লাগতো না।
– তুই তো সবসময়ই বাড়ি থাকিস। কপাল খারাপ। তাই দেখা হয় নাই। না হলে তুই তখন কেন শশুরবাড়ি থাকবি? আর আমি আসছি তাই তোকে তোর শশুরবাড়ি থেকে ডেকে আনবো এটা কেমন দেখায়? তোর শশুরবাড়ির লোকজনই বা কী ভাবতো?
– হইছে। কেউ কিছু ভাবতো না। আমার শশুরবাড়ির লোকজন আমায় অনেক আদর করে।
– তাহলে তো তোর রাজকপাল।
কিছু সময় কথা হলো। কথা দিলাম পরেরবার বাড়ি গেলে ওদের বাড়ি যাব। ও শশুরবাড়ি থাকলেও খবর পাঠাব। আর ভুল হবে না।
এরপর প্রায় বছরখানেক কেটে গেল। এরমধ্যে বাড়ি যাওয়া হয়নি। মিলির সাথে কথাও হয়নি।
সন্ধ্যারাত। আমি বাসে। ফার্মগেট থেকে মিরপুর যাচ্ছি। ফোনটা বেজে উঠলো। আব্বুর নাম্বার। রিসিভ করলাম—স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য। আমায় জানালো মিলি দুপুরে মারা গেছে। ডেলিভারি কেস। বাচ্চা, মা কাউকে বাঁচানো যায়নি। আমি অশ্রুহীন বাকরুদ্ধ। ওর ফ্যাকাশে মুখ দেখার মতো সাহস আমার নেই।
মিলি মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর পর ঢাকা ছাড়লাম। প্রথমে ফুপুবাড়ি। যখন ফুপুবাড়ি পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যার আযান দিচ্ছে। ঘরে ঢুকে ব্যাগ রেখে ফুপুকে জিজ্ঞেস করলাম মিলির কবর কোথায়?
‘ঘরের পেছনে নতুন কবরটা ওর’—ফুপুর বেদনার্থ উত্তর।
কল থেকে অযু করে কবরের কাছে গেলাম। দোয়া-দরূদ পাঠ করে আল্লাহ্র কাছে ওর জন্য দোয়া করলাম। আমি অশ্রুসিক্ত। ওর কবরের দিকে তাকিয়ে ক্ষমা চাইলাম। ওর খুব ইচ্ছা ছিল আমাকে আরেকবার দেখার। আমি তা পূরণ করতে পারলাম না।
নিজেকে অপরাধী লাগছে। আমি পারলাম না ওর অল্পবয়সে বিয়ে হওয়া আটকাতে। আমার অপারগতা; আর ওর অকালমৃত্যু। দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসছে – অশ্রুজলে। মনে হলো মিলি সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে বলছে—‘আমাকে খুঁজে পাবে অন্য কারো মাঝে।’
মিলি মারা গেছে আজ অনেক বছর। এরপর আর কখনও ফুপুবাড়ি যাওয়া হয়নি।